প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই স্ট্রোকের সর্বোত্তম চিকিৎসা
বাংলাদেশ বার্তা টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
স্ট্রোক বাংলাদেশসহ বর্তমান বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা ও পরনির্ভরশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একবার স্ট্রোক হলে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ পথ।
স্ট্রোক কী এবং কীভাবে হয়?
স্ট্রোক মূলত মস্তিকের রক্তনালীর রোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, রক্তনালী বিশেষ করে ধমনীর গাত্রে চর্বি জমে ধমনী রুদ্ধ হয়ে মস্তিকে পর্যাপ্ত রক্ত চলাচলকে বাধাগ্রস্থ করে এবং মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা মস্তিস্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে মস্তিকের মধ্যে রক্তক্ষরণ হয়ে মস্তিস্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিভিন্ন লক্ষণের মধ্যমে তা প্রকাশ পায়।
স্ট্রোক কত ধরনের হয়?
প্রধানত দুই ধরনেরঃ
১। ইসকেমিক স্ট্রোকঃ
মস্তিষ্কের রক্তনালী রুদ্ধ হয়ে যে স্ট্রোক হয়।
প্রায় ৮৫ শতাংশ স্ট্রোকই ইসকেমিক স্ট্রোক।
২।হেমোরেজিক স্ট্রোকঃ
রক্তনালী ফেটে রক্তক্ষরণ হয়ে যে স্ট্রোক হয়।
কী কী কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে ?
১। উচ্চ রক্তচাপ ( সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ)
২।ডায়াবেটিস
৩। ধূমপান
৪। রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি
৫।স্থুলতা
৬।হৃদরোগ
৭।বার্ধক্য (বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঝুঁকি বাড়ে)
কীভাবে বুঝবেন স্ট্রোক হয়েছে?
১। রোগীর মুখ বেঁকে যেতে পারে
২। কথা জড়িয়ে যেতে পারে
৩। হাত-পা দুর্বল কিংবা অবশ হযে যেতে পারে (সাধারণত এক হাত - এক পা কিংবা দুই পা কিংবা দুই হাত)
৪। রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে
৫। হঠাৎ তীব্র মাথা ব্যথা হতে পারে
স্ট্রোক পরবর্তী করণীয় কি?

১। কালক্ষেপন না করে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি করানো, কেননা স্ট্রোকের ৪-৬ ঘন্টার মধ্যে পোঁছালে থ্রোম্বোলাইসিস এবং মেকানিকাল থ্রোম্বেকটমির মতো উন্নত মানের চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব, যার ফলে স্ট্রোক পরবর্তী ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায়। যদিও আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে এইসব চিকিৎসা এখনো অপ্রতুল, তবে আমি চিকিৎসক হিসেবে আশার আলো দেখছি, খুব শিঘ্রই হয়তো দেশব্যাপী এসব চিকিৎসা সুবিধা পাবে এদেশের সাধারণ মানুষ।
২। রিহ্যাবিলিটেশন:
স্ট্রোকের পর সঠিক ও সময়মতো রিহ্যাবিলিটেশন রোগীর কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। রিহ্যাবিলিটেশনের উদ্দেশ্য হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ নিজে করতে সক্ষম করা, পেশির শক্তি ও সমন্বয় বাড়ানো, কথা জড়িয়ে যাওয়া ও গিলতে পারার সমস্যার উন্নতি করা, জটিলতা প্রতিরোধ (Bed sore, DVT, contracture, aspiration pneumonia, UTI) এবং মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসন করা।
স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়সমূহ—
১️। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ:
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণ। নিয়মিত প্রেসার মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন জরুরি।
২️।ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ:
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
৩️।ধূমপান ও তামাক বর্জন:
ধূমপান রক্তনালী সংকুচিত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়।
৪️। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:
কম লবণযুক্ত খাবার, কম চর্বিযুক্ত খাবার, বেশি শাকসবজি ও ফলমূল এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা।
৫️। নিয়মিত ব্যায়াম:
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৬️। ওজন নিয়ন্ত্রণ:
স্থূলতা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। BMI স্বাভাবিক রাখা জরুরি।
৭️।হৃদরোগের চিকিৎসা:
এট্রিয়াল ফিব্রিলেশনসহ কিছু হৃদরোগ থেকে রক্ত জমাট তৈরি হয়ে স্ট্রোক হতে পারে। সঠিক চিকিৎসা ও অ্যান্টিকোয়াগুলেশন প্রয়োজন হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো চিকিৎসার অংশ, প্রতিরোধের বিকল্প নয়। স্ট্রোক একটি হঠাৎ আঘাত, কিন্তু এর ঝুঁকির কারণগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
মনে রাখুন, প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই স্ট্রোকের সর্বোত্তম চিকিৎসা।
ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম
এমবিবিএস ( রামেক)
এফসিপিএস দ্বিতীয় পর্ব ট্রেইনি (নিউরোলজি)
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল।
আরও পড়ুন
স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬ পেলেন যারা
উৎপাদন কমানোর আগে ইরান দুই মাস পর্যন্ত তেল রপ্তানি বন্ধ রাখতে পারে, বলছেন বিশ্লেষকরা
গুলিবিদ্ধ সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ